Suprokash
Suprokash
February 4, 2025 at 05:16 PM
আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ : ৪৯৯ .................................. 'উই হ্যভ আ প্রে। আ প্রে।' মাস্তুলের মাথায় আড়াআড়ি ভাবে বাঁধা ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল জন। এই সপ্তাহে তার ওপরে নজরদারির দায়িত্ব। জাহাজের কিছু কাজ দলের সকলকে পালা করে করতে হয়। মাস্তুলের মাথায় চড়ে একভাবে চারপাশের দিগন্তে চোখ বোলানো এমন একটা কাজ। ছড়িয়ে থাকা অসীম নীলের মাঝে কোনো কালো বিন্দু নিজরে এলেই সতর্কবার্তা ছুঁড়ে দিতে হয়। জন পুব দিগন্তে একটা বড়ো কালো বিন্দু দেখেই চিৎকার করে উঠেছে। হু হু বাতাস আর জাহাজের কাষ্ঠল শরীরে ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দে তার ভাঙা স্বর হারিয়ে গেল। সচল বিন্দুকে দেখে নিশ্চিত হয়ে আরও একবার চেঁচিয়ে উঠল সে, 'ক্যাপ্টেন, শিকার। ডাইনে শিকার।' 'শিকার' শব্দটা কানে বাঁধতেই ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা জনের দিকে নজর ফেরাল এডওয়ার্ড। ডানহাত তুলে কিছু দেখাতে চাইছে ছেলেটা! ডেক থেকে বাঁ পা তুলে বোস্প্রিট ধরে কিছুটা এগিয়ে গেল সে। তার পায়ের ঠিক নিচে অস্থির তরঙ্গমালা। গত পাঁচদিন ধরে তারা বার্বাডোসের পশ্চিমে সেন্ট ভিনসেন্ট আগ্নেয়দ্বীপের আশেপাশে অলসভাবে ঘোরাঘুরি করছে। শিকারের আশায়। জায়গাটা বাছাই করার পেছনে এডওয়ার্ডের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস নিয়ে আসা ফরাসি বণিকপোতগুলো পোর্তো রিকো হয়ে এই পথে যাতায়াত করে। যেহেতু ফরাসি জাহাজ, তাই রয়‍্যাল নেভি নিযুক্ত ম্যান অন ওয়ারের পাহারা থাকবে না। তবুও ফরাসি জল সীমানার কাছাকাছি থেকে তাদেরই জাহাজ লুঠ করা বেশ ঝুঁকির। এডওয়ার্ড ইচ্ছে করেই ঝুঁকিটা নিয়েছে। সফল হলে তার প্রতি দলের সকলের আস্থা এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। সবার সামনে নিজের অকুতোভয় স্বরূপ তুলে ধরে সীমাহীন সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারবে। এই সময় ঘন ঘন সামুদ্রিক তুফান ওঠে। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে খড়কুটোর মতো ভেসে যায় স্কুনার, স্লুপগুলো। কখনো ঝড়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সলিলসমাধি ঘটে। নভেম্বর ডিসেম্বর এই দুটোমাস ছোটো তো বটেই, মাঝারি মাপের জাহাজের পক্ষেও ক্যারিবিয়ান এলাকায় ঘোরাঘুরি করা বিপজ্জনক। অধিকাংশই এই দুটো মাস ছুটির আমেজে কাটায়। পরিবারের কাছে ফিরে যায়, কিংবা নতুন পরিবার বানায়। চাইলে এডওয়ার্ডও ছুটি কাটাতে পারত। দু-দুটো লুঠ বাবদ তোষখানায় যা জমেছে, স্বচ্ছন্দে দু'মাস কাটিয়ে ফিরতে পারত। দলের সকলে সানন্দে রাজিও হয়ে যেত। কিন্তু এখন বিলাসিতা করার সময় নয়। নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করতে হবে সকলের কাছে। তার নিজের কাছেও। এই সুবিশাল আটলান্টিককে ছাপিয়ে নিজেকে তুলে ধরতে হবে। থমাস তাকে একটা নতুন নাম দিয়েছে। ভারি এবং শুনলেই আতঙ্ক জাগে এমন নাম। সময় এসেছে সেই নতুন নামের সঙ্গে সকলের পরিচিত হওয়ার। 'প্রস্তুত হও হে সাগর।' ঝাঁকড়া দাড়িতে হাত বুলিয়ে অস্ফুটে বলে উঠল এডওয়ার্ড। তারপর কোমরের বেল্টে গুঁজে রাখা দূরবীনটা বের করল। জাহাজের দুলুনি মোটা কাঠের বোস্প্রিট থেকে তার অভ্যস্ত পা দুটোকে নড়াবার চেষ্টা করছে। পারছে না। দূরবীনে চোখ রাখতেই হাসি ফুটে উঠল এডওয়ার্ডের মুখে। ঠিক যেমনটা সে চেয়েছিল। একটা ফ্রিগেট। মাস্তুলে ফরাসি নিশান। দ্রুত জাহাজের দূরত্ব এবং গতিপথ বুঝে নিল সে। তারপর চিৎকার করে উঠল, 'পাল তোলো। সময় এসেছে। তৈরি হও সকলে। ফরাসি বন্ধুদের নরকে স্বাগত জানাতে তৈরি হও।' এডওয়ার্ড বোস্প্রিট থেকে লাফিয়ে ডেকে নামল। ফরাসি ফ্রিগেট আগ্নেয়দ্বীপের কাছাকাছি আসার আগেই ওখানে পৌঁছে যেতে হবে। তাদের এই ছোটো গ্রুপ নিয়ে শক্তিশালী ফ্রিগেটের মুখোমুখি লড়াইতে নেমে পড়া হয়তো মূর্খামি। বিপক্ষের জাহাজে নিশ্চয়ই কামান আছে। সংখ্যায় সম্ভবত কুড়ির নিচে হবে না। এদিকে তাদের সুপে কামান বসানোর বন্দোবস্তই নেই। শুধু চেইন শটস এবং ফায়ারিং ব্যারেল আছে কিছু। বেশ কিছু বন্দুকও আছে, কিন্তু ভারী কামানের সামনে সেসব অতটা কার্যকরী নয়। ভোঁতা। বিপক্ষ যদি একবার বাগে পেয়ে ব্রডসাইড ফায়ার করে, তাদের গ্রুপ ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। নিকোলাস ব্রাউনের মতো পরিসমাপ্তি ঘটবে এডওয়ার্ড টিচ্। মুখোমুখি নয়, শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পেড়ে ফেলার একমাত্র কৌশল, আক্রমণ শানাতে হবে আচম্বিতে। ফরাসিরা কিছু বুঝে ওঠার আগে ওদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে হবে। তারপর প্রবল হুঙ্কারে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। প্রথম আঘাত এতটাই জোরালো হওয়া দরকার, যাতে ওরা সামলে ওঠার আগেই ডেকের দখল নিয়ে ফেলা যায়। তার জন্য ফরাসি ফ্রিগেটের আগেই তাদের ভিনসেন্ট দ্বীপের মুখে পৌঁছাতে হবে। জাহাজের হুইল এতক্ষণ স্টিফেন ড্যানিয়েলের হাতে ছিল। প্রায় ঝটকা মেরে তার হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিল এডওয়ার্ড। সর্বশক্তিতে ঘুরিয়ে দিল জাহাজের অভিমুখ। পশ্চিম দিক থেকে হু হু করে ভেসে আসছে চিরযুবক বাতাস। পৃথিবীর বয়স বাড়লেও তাদের নিরবধি বয়ে যাওয়াতে ক্লান্তি নেই। যেন কোনো আদি নেই, অন্ত নেই। এই একঘেয়ে একটানা বাতাসের টানেই গুয়েনা থেকে কিউবা ছুটে চলে পাল তোলা ফরাসি ব্রিগেনটিন, ফ্রিগেটগুলো। পেটে ভরে নিয়ে যায় তুলো, লোভনীয় পানীয় কিংবা কালো চামড়ার ক্রীতদাস। আগ্নেয় দ্বীপকে বাঁ দিকে রেখে, তার আড়াল নিয়ে আড়াআড়ি ছায়ার মতো ভাসছিল এডওয়ার্ডদের স্লুপ। হিংস্র শ্বাপদের মতো শিকারের অপেক্ষায় ওরা ওঁত পেতে রইল বেশ কিছুক্ষণ। অবশেষে দ্বীপের ওপাশ থেকে নাক বের করতে দেখা গেল ফরাসি বণিকপোতকে। শিকারকে খুব কাছ থেকে দেখে এডওয়ার্ডের মন ক্ষণিকের জন্য দুলে উঠল। সে ভুল করছে না তো? নিজের ওজন বোঝাতে ফরাসি জাহাজের মহড়া নিতে গিয়ে কড়া মাশুল গুনতে না হয়। ফরাসি ফ্রিগেটগুলো আগে যুদ্ধের প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হতো। সেই প্রয়োজন ফুরিয়েছে। অনেক ফরাসি ফ্রিগেট এখন পণ্যবাহী জাহাজে রূপান্তরিত। কিন্তু সামনের এই ফ্রিগেট যদি সাধারণ বণিকপোত না হয়? সেক্ষেত্রে শিকারির নিজেই শিকারে পরিণত হওয়ার ষোলো আনা সম্ভাবনা! এডওয়ার্ড ডেকে জড়ো হওয়া তার সহযোদ্ধাদের ওপরে নজর বুলিয়ে নিল। একই দোলাচলতা থাবা বসাচ্ছে সকলের মনে! একটু আগেই তারা রক্তের গন্ধ পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। এখন শরীরী ভাষা বদলে গেছে। কাঁধ ঝুলে পড়েছে। হাতের মুঠোয় ধরা কাটলেস বুঝি এখনই আলগা হয়ে খসে পড়বে। আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস নিল এডওয়ার্ড। দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সঙ্গে বুকের ভেতর জমা হওয়া সমস্ত শঙ্কাকে বের করে দিল। তারপর নিজের অতিকায় চেহারা ঝাঁকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, 'শয়তানের দল, মনের হাল ধরো। এখানে সাগরের জল বড্ড ফ্যাকাসে। চলো ভাইয়েরা, ফরাসি রক্তে একে গাঢ় করে তোলা যাক।' হুঙ্কারে কিছুটা কাজ হলো। নড়েচড়ে দাঁড়াল সকলে। হাতের মুঠো শক্ত হলো আবার। হুইল আবার স্টিফেনের হাতে সঁপে খোলা কাটলেস নিয়ে লাফিয়ে মেইন ডেকে নেমে এল এডওয়ার্ড। হাতে ধরে রাখা ইস্পাতের ফলায় সূর্যের আলো ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল পাটাতনে। 'দামি শিকার বন্ধুরা। পানীয় কিংবা ময়দার বস্তার বদলে সোনার পাত থাকলে কেউ অবাক হয়ো না যেন।' একটু দূর থেকে চিৎকার করে উঠল থমাস। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই গলা উঁচুতে তুলে এডওয়ার্ড বলল, 'শুধু মনে রেখ, লুঠের এক কোয়ার্টার ভাগ আমার।' জাহাজের ডেকে যতটুকু দ্বিধা অবশিষ্ট ছিল, ক্যাপ্টেন এবং কোয়ার্টার মাস্টারের কথায় বাষ্প হয়ে গেল। মৃদু হাসির ঢেউ উঠল উৎকণ্ঠিত মুখগুলোতে। একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলল কয়েকজন, 'আমরা ধনী হতে চলেছি।' ভিনসেন্ট দ্বীপের ওপাশ থেকে ফরাসি ফ্রিগেটের বিরাটাকার চেহারা পুরোপুরি বেরিয়ে আসতেই চিৎকার করে উঠল এডওয়ার্ড, 'সামনে এগোও। প্রস্তুত থেকো সকলে। সঙ্কেত পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।' বলা মাত্র দু'দিকের কুড়িখানা দাঁড় সমুদ্রের বুকে একসঙ্গে আঁচড় কাটতে শুরু করল। ........................... নষ্ট চাঁদের আলো অলোক সান্যাল ........................... প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী অলংকরণ : সৌজন্য চক্রবর্তী , অদ্বয় দত্ত মুদ্রিত মূল্য : ৫৯০ টাকা সুপ্রকাশ
Image from Suprokash: আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় সুপ্রকাশ : ৪৯৯ ...............................
❤️ 1

Comments